শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

একক যুদ্ধবিরতি ইথিওপিয়ার

ফোকাস ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ১৯৭০, ০৬:০০ এএম
একক যুদ্ধবিরতি ইথিওপিয়ার

আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় ২০১৮ সালে আবি আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দুই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটানোয় শান্তিতে নোবেলও পান তিনি। কিন্তু নিজ দেশের স্বাধীনতাকামী অঞ্চল টাইগ্রেতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন। উলটো রাজনৈতিক সংস্কারের নামে টাইগ্রেয়ানদের কোণঠাসা করার বহু অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর প্রভাবেই টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট পার্টির (টিপিএলএফ) সঙ্গে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে গত বছরের নভেম্বরে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

প্রায় আট মাস টাইগ্রেয়ান নেতৃত্ব দমনে সেনাবাহিনী পাঠান আবি আহমেদ। পরবর্তী সময়ে ২০ জুন এককভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ইথিওপিয়া সরকার। এরপর শুরু হয় শান্তি আলোচনার উদ্যোগ। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে বেশ কয়েকবার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়। এরই মধ্যে টাইগ্রেতে সীমিত আকারে পণ্য সরবরাহের অনুমতি দেয় সরকার। এর জেরে টিপিএলএফ সরকারকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করে। তবে সরকার কোন ধরনের আলোচনা হয়েছে বলে স্বীকার করেনি। বিশেষত মেলেকে এলাকায় প্রায়ই দুই পক্ষের গুলিবিনিময়ের অভিযোগ পাওয়া যায়।

মন্তব্য করুন

মুক্তির লড়াইয়ের আরেক নাম ভিয়েতনাম
বিশ শতকের পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত গোটা বিশ্ব এক অবিরত প্রাণক্ষয়ের সাক্ষি হয়েছিল। একের পর এক অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছে ভিয়েতনাম। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতার ক্ষত আজও অনেকে বহন করে বেড়াচ্ছেন। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হলেও ভয়াবহ এক গণহত্যা চালায়। ১৯৪৬-৫৪ পর্যন্ত ভিয়েতনামিরা প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধে লড়াই করে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে। এ যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে ভাগ করা হয়। সাম্যবাদীরা পায় উত্তর ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণ আর দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাম্যবাদবিরোধী শাসন শুরু করে। তবে উত্তর ভিয়েতনামের সাম্যবাদীরা একটি একত্রিত সাম্যবাদী ভিয়েতনাম গঠন করতে চাচ্ছিল। ১৯৫৯-৭৫ পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘটিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত এ ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এটি দ্বিতীয় ইন্দোচীন যুদ্ধ নামেও পরিচিত। যুদ্ধের একপক্ষে ছিল উত্তর ভিয়েতনামি জনগণ ও ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট এবং অন্যপক্ষে ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামি সেনাবাহিনী ও মার্কিন সেনাবাহিনী। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কিছুটা উদ্বেগে ভুগতে শুরু করেন। তাদের মনে হয়েছিল, সমগ্র ভিয়েতনাম সাম্যবাদী শাসনের অধীনে এলে ‘ডমিনো তত্ত্ব’ অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়বে। এ উদ্বেগ থেকেই ভিয়েতনাম বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে। তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাম্যবাদবিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। কিন্তু এ সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতিবাদে দক্ষিণ ভিয়েতনামে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামি সরকারের পতন রোধকল্পে সেখানে সৈন্য পাঠায়; কিন্তু এর ফলে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, তাতে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারেনি। এ যুদ্ধে প্রায় ৩২ লাখ ভিয়েতনামের নাগরিক মারা যান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হন। যুদ্ধ বন্ধে প্যারিসে শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৯-৭৩ সালের মধ্যে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভিয়েতনামের পক্ষ থেকে জুয়ান থুই, লি ডাক থো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০ থেকে শান্তি চুক্তির ব্যাপারে গোপনে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালের ২৩ জানুয়ারি প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ৮০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া, যুদ্ধবিরতি,দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাধারণ নির্বাচন, দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের দক্ষিণ ভিয়েতনামে অবস্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সময়ের প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত থাকে। কিছু অঞ্চলে তখনো যুদ্ধ চলছিল। ২৯ মার্চের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার করে। উত্তর ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ হতে থাকে। উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। মে ও জুন, ১৯৭৩ সালে কিসিঞ্জার এবং থো শান্তি চুক্তির উত্তরণে প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৩ জুন, ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। ১৯৭৫ সালে সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ সালে এটি সরকারিভাবে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে।
মুক্তির লড়াইয়ের আরেক নাম ভিয়েতনাম
আজারবাইজান আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতি
নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল ঘিরে আজারবাইজান ও জাতিগত আর্মেনিয়ার মধ্যে সংঘাত ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই ব্যর্থ। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আজারবাইজান আর্মেনিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন আর্তসাখে আক্রমণ চালায়। এভাবে শুরু হয় আজারবাইজান-আর্মেনিয় যুদ্ধ। যুদ্ধে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী আর্তসাখ দখলে নেয়। আজারবাইজানের সরকার এ যুদ্ধকে ‘আর্মেনিয়ায় শান্তি স্থাপ্ন অভিযান’ এবং ‘প্রতি আক্রমণ অভিযান’ বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে আর্মেনিয়ার সংবাদমাধ্যম এই যুদ্ধকে ‘আজারবাইজানি আগ্রাসন’ বলে আক্রমণ করে। এমন জটিল সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে রাখে। তারা উল্টো আজারবাইজানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে মুনাফা করে। আজারবাইজানে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে ইসরায়েল ও তুরস্কও লাভবান হয়। আর রাশিয়া আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান—দুই পক্ষের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করে। প্রায় দশ দিন এ যুদ্ধ চলে। পরে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় দুটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি, মোট তিনটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যস্থতায় আজারবাইজানি রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ এবং আর্মেনীয় প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় মাস ধরে চলে আসা আজারবাইজানি-আর্মেনীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে।
আজারবাইজান আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতি
আবার কি আক্রান্ত হতে পারে ইরান
যুদ্ধের উত্তেজনা থেকে মধ্যপ্রাচ্য গত ২৪ জুন থেকেই একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির দিকে এগোচ্ছে। ২৩ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা দেন, এতে সংঘাত দৃশ্যত শেষ হয়েছে, অন্তত এখন পর্যন্ত। কিন্তু যে ‘যুক্তি’তে ইরানে হামলা হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় ফের দেশটিতে হামলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের নেতারা—সবাই দাবি করছেন, সংঘাত থেমেছে তাদের শর্তেই। তবে আসল ঘটনা কী, ইসরায়েল কী অর্জন করল, ইরান কি নিজের কৌশলগত সম্পদ রক্ষা করতে পারল, আর এই যুদ্ধবিরতিই কি শান্তির পথে যাত্রা? উঠছে এমন নানা প্রশ্নও। কীভাবে শুরু হলো সংঘর্ষ: ২২ জুন ইসরায়েলের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প দাবি করেন, ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে’। জবাবে ২৩ জুন ইরান মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি আল-উদেইদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, মধ্যপ্রাচ্য হয়তো দীর্ঘমেয়াদি এক যুদ্ধের মুখোমুখি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, ‘ইসরায়েল ও ইরান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ শেষমেশ ইসরায়েল সীমিত পরিসরে মধ্যপ্রাচ্যে তার শুরু করা যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে উপকরণ দিয়ে সহায়তা দিয়েছিল, কিন্তু সরাসরি অভিযান চালায়নি। এবার সেই ব্যবধানও ঘুচেছে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল দাবি করে, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় ঢুকেছে এবং সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। পরে ইসরায়েল তেহরানের কাছে একটি রাডার স্টেশনে হামলা চালায়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। ইসরায়েল বহু বছর ধরেই বলে আসছে, ইরান তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। কিন্তু তারা আগে কখনো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর সরাসরি হামলা চালায়নি। ১৩ জুন ইসরায়েল সেই সীমারেখা অতিক্রম করে। নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইরান। ইসরায়েলের এ অভিযানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকে অবৈধ বলে বিবেচনা করলেও দেশটির দাবি, তারা আত্মরক্ষায় এ হামলা করেছে। আবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের সবাই ইসরায়েলের এ দাবির ব্যাপারেও একমত নয় যে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি বা এ বোমা শিগগির দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। তেল আবিব ইরানে এই ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ চালিয়েছে এমন একসময়ে, যখন ইসরায়েল এর আগেই ইরানের আঞ্চলিক মিত্র হুতি বিদ্রোহী (ইয়েমেনে), হামাস (ফিলিস্তিনের গাজায়) ও হিজবুল্লাহকে (লেবাননে) একাধিকবার আঘাত করেছে। বিগত দুই বছরে হামাস ও হিজবুল্লাহ যথেষ্ট দুর্বলও হয়েছে। ইরান কি পারমাণবিক কর্মসূচি রক্ষা করতে পারল: ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপরিভাগে ব্যাপক ক্ষতি করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, স্থাপনার ভূগর্ভস্থ অংশও ধ্বংস করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘আইএইএ’-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল কয়েক মাস পিছিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আইএইএর মতো মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া আইএইএ বলছে, ইরানের কাছে এখন প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো অজানা। ইরানের ওপর আরেকটি হামলার সম্ভাবনা কতটা: ইসরায়েল ও ইরান শুধু যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে, শান্তিচুক্তি হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে দুটি সম্ভাব্য পথ খোলা আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, আবারও আইএইএর তত্ত্বাবধানে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা এবং একটি নতুন চুক্তি করা; যেমনটা ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় হয়েছিল (জেসিপিওএ)। যদিও সেই চুক্তি থেকে ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রই একতরফা বেরিয়ে গিয়েছিল (ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে)। এমন চুক্তি করা হলে তেহরানের ওপর তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কমবে। এ প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি মিলে ২০ জুন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাসও। তিনি মার্কিন হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদিও একা ইরানকে আপোসে রাজি করাতে সক্ষম নয়, তবু সংস্থাটি মার্কিন-ইসরায়েলি কড়া অবস্থানের বিপরীতে একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থান নিতে পারে। এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরাজনীতির শিক্ষক ইয়োআনিস কোটুলাস বলেন, ‘ইরান কূটনৈতিকভাবে ইউরোপকে জড়ানোর চেষ্টা করবে, সেটি আরও বেশি তত্ত্বাবধানের প্রস্তাব দিয়ে (পারমাণবিক কর্মসূচিতে) এবং এ কর্মসূচির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে।’ তবে ইসরায়েল অতীতে ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে যে কোনো পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করার চেষ্টা করেছে। নতুন চুক্তিকেও তারা মেনে নেবে না বলেই মনে হয়। উপরন্তু, ইরান কি চুক্তির পথে হাঁটবে? যখন যুক্তরাষ্ট্র আগের চুক্তি ভেঙে দিয়েছে, পরে আলোচনার শর্তও বদলে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনা চলার সময়ই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়েছে? সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক অধ্যাপক আলী আনসারি আলজাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের ভেতরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পিছু হটার ভাষা অনুযায়ী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে। তবে দেশটির কিছু কর্মী এরই মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি তুলেছেন।’ অবশ্য এখন পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনড়। সোমবার দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি একটি বিল অনুমোদন করেছে, যেখানে আইএইএর সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে আবারও জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তিনি আবার চালু হতে দেবেন না। এই মৌলিক দ্বন্দ্ব যদি রয়ে যায়, তাহলে সামনে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সময়ের ব্যাপারমাত্র।
আবার কি আক্রান্ত হতে পারে ইরান
ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতের ভবিষ্যৎ
ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা দৃশ্যত যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, ঠিক সে মুহূর্তে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের ‘অবিলম্বে অস্ত্রবিরতিতে’ সম্মত হওয়ার খবর দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ ঘোষণার পরপরই ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তবে এর কয়েক ঘণ্টা পরই দুই দেশ পাল্টাপাল্টি অস্ত্রবিরতির লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ভারত-পাকিস্তান আগেও কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। তবে এবার প্রথমবার তারা ড্রোন যুদ্ধে নামে। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তারা সংঘাতে না জড়ালেও বাগযুদ্ধ- পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নেওয়া চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল—২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হন। এ জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ৭ মে দেশটির অভ্যন্তরে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে অভিযান চালায় ভারতীয় বাহিনী। যদিও ওই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ইসলামাবাদ। চার দিন ধরে হামলা-পাল্টাঘাত চলে। ১০ মে অপারেশন বুনিয়ান-উন-মারসুস নামে পাল্টা অভিযান চালায় পাকিস্তান। পাল্টাপাল্টি হামলাকে কেন্দ্র করে দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। অতীতেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান সংকটের সমাধান হয়েছে ঠিকই; কিন্তু এবার এ যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কি না ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি আলোচনার পর ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি তার মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতজুড়ে আলোচনার পর ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ‘যুদ্ধ’ শব্দটির কোনো আনুষ্ঠানিক, সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা না থাকায় দেশগুলো চাইলে যুদ্ধ ঘোষণা না করেই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এই ধোঁয়াশার সুযোগে বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী সামরিক কর্মকাণ্ডের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। বিক্রম মিশ্রি এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আজ (১০ মে) ভারতীয় সময় বিকেল ৫টা থেকে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই সব ধরনের লড়াই ও সামরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, এ সমঝোতার পর ভারত ও পাকিস্তান সামরিক যোগাযোগ চ্যানেল এবং হটলাইনগুলো সচল করেছে। ভারত ও পাকিস্তান কি সত্যিই যুদ্ধের মধ্যে ছিল; আনুষ্ঠানিকভাবে ছিল না। দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন হামলা ও গোলা বিনিময়ের ঘটনা ঘটলেও কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। ভারত ও পাকিস্তান তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডকে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত ‘সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। অতীতের সংঘাতগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, বড় সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক সেনা ও নিরীহ বেসামরিক লোকজন নিহত হওয়ার পরও এ দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধের পর থেকে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় একাধিকবার তাদের মধ্যকার বিরোধের সমাধান হয়েছে। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। কার্যত তখন থেকে কাশ্মীর ভারতনিয়ন্ত্রিত ও পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত অংশে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়। এতে মধ্যস্থতা করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা: গত কয়েক দশকে নিজেদের মধ্যে হওয়া একাধিক সংঘর্ষে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একে অন্যের বিরুদ্ধে উন্নত মানের যুদ্ধবিমান, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। কিন্তু মে মাসে টানা চার দিনের সংঘর্ষে প্রথমবারের মতো নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ ব্যাপকভাবে একে অন্যের বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর প্রতিবেশী ওই দেশ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ থামে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার এ দুই শক্তি এখন ড্রোনকে ঘিরে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে। রয়টার্সের নেওয়া দুই দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তা, শিল্প নির্বাহী, বিশ্লেষকসহ ১৫ জনের সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ভারত ও পাকিস্তান গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে।
ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতের ভবিষ্যৎ
যুদ্ধবিরতি কি মহাঝড়ের পূর্বলক্ষণ
যুদ্ধবিরতি কি মহাঝড়ের পূর্বলক্ষণ