বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩৩

রমজানে ইতিকাফ: সওয়াবের অনন্য উৎস

বেলায়েত হুসাইন
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
রমজানে ইতিকাফ: সওয়াবের অনন্য উৎস

আল্লাহর শুকরিয়া যে, এখন আমরা রমজান মাসের শেষ দশকে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এটি সেই দশক, যার বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও পুরো রমজানই ইবাদত, জিকির-আজকার, কোরআন তিলাওয়াত, ফরজ ও নফল আমলের প্রতি যত্ন, দান-সদকা, নেকি-সওয়াব ও সৎকর্মের মাস; তবুও এর শেষ দশকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ দশকে অন্য দিনগুলোর তুলনায় ইবাদতের প্রতি আরও বেশি যত্ন ও গুরুত্ব দিতেন।

রাসুল (সা.) নিজেও রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং তার পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি রমজানে ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন।

একবার কোনও কারণে তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি; তখন তার পরিবর্তে তিনি শাওয়াল মাসে ইতিকাফ করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, এই আমলটি রাসুল (সা.)-এর কাছে কতটা প্রিয় ছিল।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার ও জাহান্নামের মাঝখানে তিনটি পরিখা পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন, যার প্রতিটির প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি হবে।’

একইভাবে তিনি ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ১০ দিনের ইতিকাফ করবে, তার এই আমল দু’টি হজ ও দু’টি ওমরার সমান (সওয়াব বিবেচনায়) হবে।’

ইতিকাফ রমজানুল মোবারকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হিজরির দ্বিতীয় বছরে রোজা ফরজ হওয়ার পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত মহানবী (সা.) সবসময় রমজানে ইতিকাফ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেঈন (রহ.) এবং তাবে-তাবেঈন (রহ.)-রাও এই সুন্নতের ওপর গুরুত্বসহকারে আমল করতেন।

সওয়াবের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াবি ব্যস্ততা ত্যাগ করে আল্লাহ তায়ালার দরবার; অর্থাৎ মসজিদের দিকে মনোনিবেশ করে।

নফল ইতিকাফ অল্প সময়ের জন্যও করা যেতে পারে। তবে সুন্নত ইতিকাফ হলো রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ, যা সুন্নতে আলাল কিফায়া। অর্থাৎ কোনও মহল্লায় যদি একজন মানুষও ইতিকাফ করে, তাহলে অন্যদের ওপর থেকে এ দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। রমজান মাসের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে ইতিকাফ শুরু করা হয় এবং ঈদের চাঁদ উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) রমজানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছিলেন এবং এরপর দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফ করেছিলেন। এরপর তিনি যে তাঁবুতে ইতিকাফ করছিলেন সেখান থেকে মাথা বের করে বললেন, ‘আমি প্রথম দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান ও তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করেছিলাম। পরে একই কারণে দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফ করেছি। এরপর আমাকে কেউ (অর্থাৎ একজন ফেরেশতা) জানিয়ে দিয়েছে যে, সেই রাতটি রমজানের শেষ দশকে রয়েছে। সুতরাং যারা আমার সঙ্গে ইতিকাফ করছে, তারা যেন শেষ দশকেও ইতিকাফ করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত এটাই তার নিয়ম ছিল। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম) আর হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিল, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি)

ইতিকাফের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করা, সব দিক থেকে নিজেকে একাগ্র করে তার ইবাদতে নিমগ্ন থাকা এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুনিয়ার নানা আকর্ষণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে একান্তে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে সময় কাটানোই ইতিকাফের মূল লক্ষ্য।

ইতিকাফের সময় অন্যান্য দুনিয়াবি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে ইতিকাফের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে যায়। তাই ইতিকাফকারী ব্যক্তির উচিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, শিক্ষা ও শিক্ষাদান এবং অন্যান্য ইবাদতে অধিকাংশ সময় ব্যয় করা। এর বাইরে যে কাজগুলো আছে, সেগুলো পরিত্যাগ করে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হওয়া।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইতিকাফকারীর সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইতিকাফকারী (ইতিকাফের সময়) গুনাহ থেকে বিরত থাকে; তাই তার জন্য সব ধরনের নেকি লেখা হয়।’ অর্থাৎ ইতিকাফকারী ব্যক্তি ইতিকাফের কারণে গুনাহ থেকে দূরে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ও দয়ার বিষয় হলো- এই সময় তার জন্য সেই সব নেকিও লিখে দেওয়া হয়, যা সে সাধারণত মসজিদের বাইরে থাকলে করত।

পক্ষান্তরে এভাবে লেখা হয় না যে, সে যদি বাইরে থাকত তাহলে অমুক গুনাহ করত; বরং লেখা হয় যে, সে বাইরে থাকলে অমুক নেক আমল করত এবং সেই নেকির সওয়াবও তার জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রমজান মাসের শেষ দশকের এই ইতিকাফ সুন্নতে মুআক্কাদা আলাল কিফায়া। অর্থাৎ কোনও একটি গ্রাম বা মহল্লায় যদি একজন ব্যক্তিও ইতেকাফ করেন, তবে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু যদি পুরো মহল্লা থেকে কেউই ইতেকাফ না করেন, তাহলে সবাই সুন্নত পরিত্যাগের গুনাহে গুনাহগার হবেন।

আর যেহেতু, ওফাতের আগ পর্যন্ত স্বয়ং নবী করিম (সা.)-ও এ আমল অব্যাহতভাবে আদায় করেছিলেন। তাই মুসলমানদেরও এই সুন্নতকে সামষ্টিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তারা যদি সমষ্টিগতভাবে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এই প্রিয় আমলের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করে, তাহলে তা হবে তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

আল্লাহ আমাদের সকলকে এই গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে ইতিকাফ পালন করে অনন্য সওয়াব অর্জনের তাওফিক দান করেন। আমিন

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক

মন্তব্য করুন